বিশ্বজনীন আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর

বিশ্বজনীন আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর

ধর্মচিন্তা

বিশ্বজনীন আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর

বিশ্বজনীন আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর

মাওলানা মহবুবুর রহমান

পবিত্র রমজানের ত্যাগ-তিতিক্ষার সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের একফালি বাঁকা চাঁদ ঈদুল ফিতরের জানান দেয়।
আকাশমাঝে চাঁদের দৃশ্যপট বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়মনে ঈদের অনাবিল সুখ ও আনন্দের ছটা দেখা দেয়। ঈদের আবেগঘন অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। তবে এবছর করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে বিশ্ব মানব তটস্থ। তাই এ সংকটক্ষণে ঈদ উদযাপন বরাবরের মতো যে হচ্ছে না তা বলাই বাহুল্য।সংগত কারণেই এবারের ঈদ হবে কোভিড প্রটোকল তথা স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশিকার আধারেই।

আসলে ‘ঈদুল ফিতর’ শব্দ দুটি আরবি, যার অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি, রোজা ভেঙে ফেলা ইত্যাদি। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা ও ইবাদত-বন্দেগির পর বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ শাওয়ালের চাঁদের আগমনে রোজা ভেঙে আল্লাহর বিশেষ শুকরিয়াস্বরূপ যে আনন্দ-উৎসব করে ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় তা-ই ঈদুল ফিতর।

ঈদ আসলে শাশ্বত ইসলামের একটি আনন্দ ঘন পূণ্যকর্ম। ঈদুল ফিতর দোয়া কবুলের দিন। ঈদুল ফিতরের রাত দোয়া কবুলের রাত। ঈদের প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে দেখা যায়, হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, ‘প্রতি বছর মুশরিকদের জন্য দুটি দিন ছিল সেদিন তারা আনন্দ-উৎসব করত। রসুল (সা.) যখন মদিনায় আসেন তখন তিনি বলেন, তোমাদের ওই দুটি উৎসবের চেয়ে আরও উত্তম দুটি আনন্দের দিন দেওয়া হলো- ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।’ নাসায়ি, আবু দাউদ।

ঈদুল ফিতর সারা বিশ্বের মুসলমানের সর্বজনীন আনন্দ-উৎসব। নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-বেদনা সব ভুলে ঈদের দিন মানুষ সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়। ঈদগাহ সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে নতুন করে আবদ্ধ করে। ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরে প্রেমের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আনন্দ ভাগাভাগি করে। রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের অতীত জীবনের সব পাপ থেকে মুক্ত হতে পারার পবিত্র অনুভূতি ধারণ করেই পরিপূর্ণতা লাভ করে ঈদুল ফিতরের খুশি। ঈদুল ফিতরের নামাজ ওয়াজিব। অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে এ নামাজ আদায় করতে হয়।

ঈদ আসলে বান্দার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত বিধান রোজা রোজা এবং তা পালন করার তৌফিক দেওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার এবং তাঁর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব বর্ণনা করার উৎসব। । এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহতাআলা বলেন, এবং (তিনি চান) যাতে তোমরা (রোজার) সংখ্যা পূরণ করে নাও এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন সেজন্য আল্লাহর তাকবির পাঠ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সুরা বাকারা : ১৮৫)।

অতএব, আমাদের ঈদ আনন্দ উদযাপিত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক এবং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসারে। আমাদের আনন্দ উদযাপন হবে পাপ পঙ্কিলতামুক্ত। নিম্নে একজন মুমিনের ঈদ উদযাপন কেমন হবে সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা হলো-

১) ঈদের রাত্র ইবাদত বন্দেগী তে কাটানো। কেননা, হযরত আবু উমামা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেছেন,যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সওয়াবের প্রত্যাশায় ঈদের রাত এবাদতে কাটাবে, তার হৃদয় ঐ দিন জীবিত থাকবে যেদিন সবার হৃদয়-মন থাকবে মৃত।

২) অন্য দিনের তুলনায় সকালে ঘুম থেকে ওঠা। (সুনানে কুবরা, বাইহাকি, হাদিস ৬১২৬)

৩) মিসওয়াক করা। (হাশিয়াতুত তাহতাবি পৃ: ২৮৯)

৪) গোসল করা। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৩১৫)

৫) সামর্থ্য মোতাবেক ঈদের দিন উত্তম পোশাক পরিধান করা এবং বৈধ সাজগোজ গ্রহণ করা।
(সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস ১৭৬৬; সুনানে কুবরা, বাইহাকি, হাদিস ৬১৪৩)

৬) সুগন্ধি ব্যবহার করা। (আদ্দুররুল মুখতার ২/১৬৮)

৭) ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টিজাতীয় জিনিস, যেমন- খেজুর ইত্যাদি খাওয়া। তবে ঈদুল আজহাতে কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং ঈদের নামাজের পর নিজের কোরবানির গোশত দ্বারা আহার করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৫৩; জামে তিরমিজি, হাদিস ৫৪২)

৮) নামাজের জন্য ঈদগাহের দিকে রওনা হওয়ার আগে তিনটি, পাঁচটি বিজোড়সংখ্যক খেজুর খাওয়া সুন্নত। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, ‘প্রিয় নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে না খেয়ে ঈদগাহে রওনা করতেন না আর তিনি বিজোড়সংখ্যক খেজুর খেতেন।’ বুখারি।

৯) সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১১৫৭)

১০) ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা। (আদ্দুররুল মুখতার ২/১৬৮)। পরে আদায় করলে মকরূহ হবে।

১১) ঈদের দিন রোজা না রাখা। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর আজ বান্দার আনন্দের দিন। তাই আল্লাহতাআলা হারাম করে দিয়েছেন এ দিনের রোজা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৩)

১২) ঈদের দিন ইশরাকের নামাজ পড়া হারাম। ঈদের দিন সম্মিলিতভাবে জিয়ারত করাও বর্জনীয়। তবে একা একা জিয়ারত করতে পারেন‌।

১৩)ঈদের দিনের একটি বিশেষ আমল হলো বেশি বেশি তাকবির বলা। তাকবির হলো, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আল্লাহু আকবর, আল্লাহ আকবর, ওয়া লিল্লাহিল হামদ। (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস ১৭১৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকি, হাদিস ৬১২৯)

১৪)রমজানের শেষ দিন সূর্যাস্তের পর অর্থাৎ ঈদের রাত থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ আদায় পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা। তাকবিরের শব্দগুলো হচ্ছে- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। পুরুষের জন্য উচ্চস্বরে তাকবির বলা সুন্নত। মহিলারা নিঃশব্দে তাকবির বলবেন।’ মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা। ‘ঈদের দিন হেঁটে ঈদগাহে আসা-যাওয়া সুন্নত।’ ইবনু মাজাহ।

১৫)ঈদগাহে এক পথে যাওয়া। আরেক পথে ফেরা। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১২৯৫)

১৬) পরস্পরের সাক্ষাতে এই দোাটি পাঠ করা, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম (আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের আমলগুলো কবুল করুন)। (ফাতহুল বারি ২/৪৪৬)

১৭) সাধ্যানুযায়ী অধিক পরিমাণে দান খয়রাত করা। (আদ্দুররুল মুখতার-২/১৬৯)

১৮)ঈদের নামাজের পর ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করা এবং মুক্তাদির একাগ্রচিত্তে খুতবা শুনা।কেননা খুতবা পাঠ করা সুন্নত ও তা শ্রবণ করা ওয়াজিব।

উল্লেখ্য, খুতবা পাঠের সময় চাঁদা সংগ্রহ করা, কথাবার্তা করা জায়েজ নয়। তাছাড়া কিছু মানুষ ঈদের নামাজ সমাপ্ত করেই খুতবা এড়িয়ে ঈদগাহের মাঠ ত্যাগ করেন । এতে তাদের একটি ওয়াজিব অনাদায় থেকে যায়। এতে তারা গোনাহগার হন। এই অভ্যাস ত্যাগ করা জরুরি।

এর পাশাপাশি শরিয়তের সীমার ভিতর থেকে সামাজিকতা রক্ষা এবং আনন্দ-বিনোদনে অংশগ্রহণ করায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।তবে বর্তমানে চলমান করোনা অতিমারির লোমহর্ষক সংকট ক্ষণে সমূহ স্বাস্থ্য বিধি মেনে ও সেই প্রেক্ষাপটে সরকারি সমূহ নীতি মালা মেনে ঈদ উদযাপন করা সময়ের দাবি।

মুসলিম মিল্লাত নানা দল ও মতে বিভক্ত। ঈদের নামাজের এ মহামিলন থেকে মুসলমানরা ‘একই উম্মাহ’ হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা লাভ করে থাকে। ঈদগাহে মহামিলনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়াই ঈদুল ফিতরের অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি, করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে স্বাস্থ্যবিধি ও সরকার কর্তৃক জারি করা সমূহ নীতি মালা মেনে প্রত্যেক মুসলিমকে ঈদুল ফিতর নেক আমল এবং হাসি-খুশির মাধ্যমে অতিবাহিত করার চেষ্টা করা উচিত। এ দিনের মতোই সারা বছর ইমান-আমল-তাকওয়ার জীবনযাপনের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষা অনুধাবন করে সে মোতাবেক আমল করার তৌফিক দান করুন।

দূর হোক হিংসা-বিদ্বেষ অনাচার-পাপাচার।
ঈদ যেন আমাদের জীবনে বয়ে আনে অনাবিল সুখ শান্তির বার্তা। ভ্রাতৃত্বের পয়গাম। দূর করে সব অশান্তির কালো আঁধার। প্রতিষ্ঠিত করে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও উদারতার পরিবেশ।সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।।

মাওলানা মহবুবুর রহমান পূর্ব-কানিশাইল, করিমগঞ্জ
আসাম,ভারত।পিনঃ৭৮৮৭১১
📱৯৬১৩৪৩২৩৯০
মেইল:rahmanmehbub27@yahoo.com

কালপুরানে লেখা পাঠানোর নিয়মাবলি

লেখাটি আপনাদের পছন্দ হলে অবশ্যই একটা লাইক দিবেন এবং কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। যেকোনো সমস্যায় আমার মেইল ঠিকানায় অথবা ওয়েবসাইটের চ্যাট আইকনে ক্লিক করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, ধন্যবাদ।

ফেসবুক প্রোফাইল , ফেসবুক গ্রুপ , ফেসবুক পেজ , টুইটার , হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ , টেলিগ্রাম গ্রুপ , মেইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *