অসীম করুণাসিক্ত অনন্য মহিমান্বিত রজনী শবে ক্বদর

অসীম করুণাসিক্ত অনন্য মহিমান্বিত রজনী শবে ক্বদর

ধর্মচিন্তা

অসীম করুণাসিক্ত অনন্য মহিমান্বিত রজনী শবে ক্বদর

অসীম করুণাসিক্ত অনন্য মহিমান্বিত রজনী শবে ক্বদর

মাওলানা মহবুবুর রহমান
পূর্ব-কানিশাইল, করিমগঞ্জ।আসাম,ভারত।পিনঃ৭৮৮৭১১

হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রজনী লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। আল্লাহর প্রেমে সিক্ত, জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত অর্জনের এক বিশেষ সুযোগের রাত লাইলাতুল কদর। ‘শবে কদর’ শব্দটি ফারসি।

শব অর্থ রাত বা রজনী আর কদর অর্থ মহিমান্বিত, সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। শবে কদরের অর্থ হলো মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত।

যে রাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। ইরশাদ হচ্ছে- ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ জিবরাইল (আ:)-সহ সমভিব্যাহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে।

এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা পর্যন্ত (সুরা:কদর,আয়াত-১:৫)। প্রতিবছর রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে কোনো এক বিজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত। ইরশাদ হচ্ছে- ‘শবে কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ (সুরা:কদর,আয়াত-৩)।

রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস। শবে কদর কোরআন নাজিলের রাত। এ রাতেই প্রথম মক্কার হেরা পর্বতের গুহায় আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ:)-এর মাধ্যমে রাসুল (সা:)-এর প্রতি কোরআন অবতীর্ণ হয়।

ইরশাদ হচ্ছে- ‘রমজান মাস! যে মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে মানবের দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে’ (সুরা:বাকারা,আয়াত-১৮৫)। শবে-কদর এমন এক রাত, যে রাতে সৃষ্টজীবের পূর্ণ এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রত্যেক প্রাণির রিযিক, জীবিকাসহ সর্বপ্রকার কাজ-কর্ম নির্ধারণ করা হয় বলে এই রাতকে লাইলাতুল কদর বা পরিমাপ নির্ধারণী রাত বলা হয়।

*কদর নামকরণের কারণ*
যেহেতু এ রজনী অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সম্মানিত তাই এ রজনীকে লাইলাতুল কদর বলা হয়ে থাকে। আবার এ রাত্রে যেহেতু পরবর্তী এক বৎসরের অবধারিত বিধিলিপি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সে কারণেও এ রজনীকে কদরের রজনী বলা হয়।

*সুরা কদর অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি*
ইবনে আবি হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে বনী ইসরাঈলের জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করলেন যে, তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করে অধিককাল যাবত ইবাদত করেছেন। এ সময়ের মধ্যে তারা একটিও নাফরমানি করেননি।

রাসুলুল্লাহর (সা.) জবান মোবারক থেকে এ কথা শুনতে পেরে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং নিজেদের ব্যাপারে আফসোস করতে লাগলেন।

সাহাবায়ে কেরামের এ আফসোসের পরিপ্রেক্ষিতে মহান রাব্বুল আলামিন হজরত জিবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে রাসুলের (সা.) নিকট এমন সময় এই সুরায়ে ‘কদর’ অবতীর্ণ করেন। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন ও তাফসিরে মাজহারি)

*শবে কদরের গুরুত্ব*
রাসুল (সা:)-এরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান সহকারে ও আল্লাহর কাছ থেকে বড় শুভফল লাভের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। এ রাতে বান্দার প্রতি আল্লাহর নূর বর্ষিত হয়। ফেরেশতাগণ এবং জিবরাঈল (আ:) এ রাতে যমীনে অবতরণ করেন। এ রাতের কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না (ইবনে মাজাহ ও মিশকাত)।

মহিমান্বিত এ রজনীতে সমস্ত কুমন্ত্রনা, শয়তানি ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত, অকেজো শয়তানের সমস্ত কাজ। উবাই ইবনে কা’ব (রা:) বলেন, ‘শয়তান এ রাতে কাউকে ক্ষতি বা রুগ্ন করতে পারে না, অথবা কোন বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারে না এবং কোন যাদুকর তার যাদু কার্যকর করতে পারে না’। রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন- ‘ফেরেশতারা এ রাতে রহমত, বরকত ও প্রশান্তি নিয়ে অবতরণ করেন’।

রাসুল (সা:) এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি; বরং কষ্ট করে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে খুঁজে নিতে বলেছেন। তাই শেষ দশকের প্রতি টি বেজোড় রাতে একাগ্র চিত্তে শবে কদর অনুসন্ধান করাই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় এভাবেই দিয়েছেন- ‘তাঁরা রাত্রি যাপন করে রবের উদ্দেশে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে’ (সুরা: ফুরকান,আয়াত- ৬৪)।

মহিমান্বিত এ রাতকে আল্লাহ রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লুকিয়ে রেখেছেন। বান্দাহ বিনিদ্র রজনী কাটাবে, সবর করবে এর মধ্যে খুঁজে পাবে সম্মানিত রাত, পাবে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত; ফেরেশতার অদৃশ্য মোলাকাতে সিক্ত হবে তার হৃদয়, আপন রবের ভালোবাসায় হবে সে উদ্বেলিত। এ যেন দীর্ঘ বিরহের পর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

এ দীর্ঘ প্রতিক্ষার কষ্ট-বিরহের মাধ্যমে রব তার বান্দাহকে আরো আপন করে নেন। কাজেই শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতে মশগুল হতে হবে। প্রতিটি রাতকেই লাইলাতুল কদর মনে করতে হবে। তাহলে লাইলাতুল কদর হাতছাড়া হবে না।আল্লাহ পাক বলেন, ‘তাদের পার্শ দেশ বিছানা থেকে পৃথক থাকে (তারা শয্যা গ্রহণ করে না ; ও ইবাদতে মশগুল থাকেন)।

তারা দোযখের ভয়ে এবং রহমতের আশায় তাদের প্রভুকে ডাকতে থাকে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করে থাকে। কেউ জানে না। তাদের আমালের পুরস্কারস্বরূপ (আখিরাতে) তাদের জন্য কী জিনিস গোপনে রাখা হয়েছে’ (সুরা: সিজদা, আয়াত- ১৬:১৭)।

হযরত আবু হুরায়রা (রা:)-হতে বর্ণিত, রাসুল (সা:)-এরশাদ করেন- ‘স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর’ (মুসলিম)। রাসুল (সা:) এরশাদ করেন- ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদরকে অনুসন্ধান করো। (মুসলিম)।

রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোই ( অর্থাৎ ২০, ২২, ২৪, ২৬ ও ২৮ শে রোজার দিবাগত রাত ) হলো শেষ দশকের বেজোড় রাত। রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতের মধ্যে কোনো একদিন লাইলাতুল কদর।

তবে হাদিসে এর কিছু বিশেষ নিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়ঃঝলমলে একটি প্রাশান্তির রাত হবে সেদিন। এই রাতটি হবে খুবই শান্ত ও শান্তিময়। এই রাত শেষে সকালটি হবে প্রশান্তির। এঔ রাতে প্রত্যেক বস্তুকে সেজদারত অবস্থায় দেখা যাবে। প্রতিটি স্থান হবে বেহেস্তী আলোয় আলোকিত। সবচেয়ে সুস্পষ্ট নিদর্শন হচ্ছে, এই রাতের ইবাদত অন্তরে তৃপ্তি জোগাবে। এটি ভাগ্য বা মহিমান্বিত রজনী যা দোয়া কবুলের রাত। এ রাতেই আল্লাহ আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন।

আয়েশা (রা:) রাসুল (সা:)-কে জিজ্ঞাসা করলেন- হে আল্লাহর রাসুল! (সা:)-আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে আমি ওই রাতে আল্লাহর কাছে কী দোয়া করব? রাসুল (সা:) বলেন; তুমি বলবে,(বঙ্গানুবাদ) ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন’ (ইবনে মাযাহ)।

মিশকাত শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা কবরকে আলোকময় পেতে চাও তাহলে লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত কর।

রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘রমজানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর। (মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৯)

একদা হজরত উবায়দা (রা.) নবী করীম (সা.) কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজী সেই সাহাবিকে বললেন রমজানের বেজোড় শেষের দশ দিনের রাতগুলোকে তালাশ করো। (বুখারি, হাদিস নং: ২০১৭)

ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেন, যে লোক শবে কদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হল।

আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই।

কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামশেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৭)

*শবে কদরের আমলঃ* নফল নামাজ, তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলিল মাসজিদ, আউওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল নামায। বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও দরুদ পড়া, তাওবা-ইস্তিগফার, দোয়া- তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার,বিশেষ করে পিতা-মাতার জন্য ও সব মুমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। বান্দা তার প্রভুর কাছে চায়। আল্লাহ এতে ভীষণ খুশি হন। আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এতটাই অনগ্রহশীল যে, তিনি তাঁর কাছে না চাইলে অসস্তুষ্ট হন।

‘যে আল্লাহর কাছে কিছু চায় না আল্লাহ তার ওপর রাগ করেন’ (তিরমিজি)। রাসুল (সা:)- এরশাদ করেন- ‘তোমাদের পরওয়ারদিগার লজ্জাশীল ও দাতা; লজ্জাবোধ করেন যখন তাঁর বান্দা তাঁর কাছে দু’হাত ওঠায়, তখন তা খালি ফিরিয়ে দিতে’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, বায়হাকি)।
শেষ পানে পরম স্রষ্টা আল্লার দরবারে করজোড়ে মিনতি, তিঁনি যেন তাঁর অশেষ কৃপাবশে আমাদের সবার ভাগ্যে যেন এ রাতটি নসীব করেন এবং যথার্থভআবে বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগী করার তাওফিক দান করেন। আমিন।।

কালপুরানে লেখা পাঠানোর নিয়মাবলি

লেখাটি আপনাদের পছন্দ হলে অবশ্যই একটা লাইক দিবেন এবং কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। যেকোনো সমস্যায় আমার মেইল ঠিকানায় অথবা ওয়েবসাইটের চ্যাট আইকনে ক্লিক করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, ধন্যবাদ।

ফেসবুক প্রোফাইল , ফেসবুক গ্রুপ , ফেসবুক পেজ , টুইটার , হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ , টেলিগ্রাম গ্রুপ , মেইল

1 thought on “অসীম করুণাসিক্ত অনন্য মহিমান্বিত রজনী শবে ক্বদর

  1. This topic is full of facts,full of reality, full of truth, full of documentary narrations but the description methods are so simple with also ornamented that is ONE in hundred. Allah bless you, help you for enlightening our slumber “Qaum”. Ameen ! ! !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *