বর্তমান থাক

বর্তমান থাক

গল্প সাহিত্য

বর্তমান থাক

গল্প:- বর্তমান থাক
লেখক:- মিলন পুরকাইত

রুদ্র‘র সাথে মিত্রার প্রেমের কথা হয়নি কোনও দিন তবে প্রগাঢ় বন্ধুত্বের মতো কথা হয়েছে বহুবার। এই যেমন পড়ার ব্যাপারে কোনও কিছু বোঝার অসুবিধা হলে একগাল হেসে রুদ্র বলেছে,“চিন্তা করছিস কেনো মিত্রা, অবসর মতো ঠিক বুঝিয়ে দেবো তোকে। একটু ধৈর্য্য ধর। আরে এ বন্ধু আছে কেনো তাহলে। ”

বলাবাহুল্য রুদ্র ক্লাসে সেরা স্টুডেন্টদের মধ্যে অন্যতম। সব বিষয় একেবারে তুখোড়। বুঝিয়েও দিয়েছে তাকে পারদর্শী শিক্ষকের মতো। ওর জন্যই ম্যানেজমেন্টে ভালো ফল করতে পেরেছে মিত্রা।বিয়েতে কার্ড পাঠিয়েছিল তবে বোনের বিয়ের জন্য আসতে পারেনি রুদ্র। মিত্রা তাই এবার ওর বাড়িতে যাবে বলে মনে মনে তৈরি হয়ে বাপের বাড়িতে আসে।

বাপের বাড়িতে এসে পুরোনো ডাইরি খুঁজে রুদ্র‘র ঠিকানাটা বার করে। ৪৭/৩ নয়াপাড়া লেন। সাউথ সিঁথি। কলকাতার এই দিকটা একবার মাত্র এসেছিল সে,নেমন্তন্ন খেতে।সে মানে একা নয়,অয়ন পুলক,এষা আর রত্না। তারা তখন ম্যানেজমেন্টের স্টুডেন্ট। প্রায় পাঁচ বছর আগে।

এখন ঠিকানাটা খুঁজে বার করতে অসুবিধা হতে পারে ভেবে একটা কাগজে ঠিকানাটা লিখে শান্তিনিকেতনের ঝোলানো কাঁধের ব্যাগের মধ্যে রাখে যেখানে তার “বর্তমান থাক” জনপ্রিয় উপন্যাসটা রেখেছে রুদ্রকে উপহার দেবে বলে।

হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়ে মিত্রা‘র। আরে, দুটো বাজে! পাঁচটার মধ্যে রুদ্র‘র বাড়ি পৌঁছোতে হবে। তা নইলে অনেক দেরী হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরতে। মিত্রা মনে মনে ভাবে। একটুও দেরী না করে আলমারি খুলে হ্যাঙ্গার ঠেলে ঠেলে একটা সুন্দর গোলাপী রঙের কালো পাড় তাঁতের শাড়ি বার করে, সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউসও।

শাড়ি পরে চোখে কাজল আর ছোট্ট একটা কালো টিপ কপালে লাগিয়ে ঘুরেফিরে নিজেকে পরখ করে চটি পড়ে প্রায় তিনটের সময় বাড়ি থেকে মাকে বলে বেরিয়ে যায়। ভাগ্য খুব সুপ্রসন্ন মনে হয় তার, তা না হলে রাসবিহারী থেকে সিঁথিমোড় মিনিবাসটাও কেনো সাথে সাথে পেয়ে যাবে। শুধু পাওয়া নয়, জানলার সামনে একটা খালি লেডিস সীটও পেয়ে যায়। প্রসন্ন মনে সীটে বসে বাইরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় সে।

কলকাতার হাজার দৃশ্য দেখতে দেখতে ঠিক সাড়ে চারটার সময় সিঁথিমোড় আসে। মিনিবাস থেকে নেমে বাড়ির রাস্তাটা মনে করবার চেষ্টা করে মিত্রা। উলটো ফুটে বিউটি পার্লার তার পাশে পানের দোকান, তার গা ঘেঁষে রাস্তা। বিউটি পার্লারের দোকানটা গেল কোথায়! ওটা বদলে গিয়েই কি চপ কাটলেটের দোকান হয়েছে এখন! তাই হবে। ওই রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে ডানদিকের প্রথম গলিতে বাঁহাতের মোড়ের বাড়িটা।

মিত্রা এদিক-ওদিক চোখ বোলাতে বোলাতে দেখতে পায় বাঁ হাতের মোড়ে ৪৭/৩ নয়াপাড়া লেন গোলাপী রঙের বাড়িটা। বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে বছর দুয়েকের একটা ফুটফুটে ছেলের হাত ধরে মিষ্টিমুখের একটা বৌ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মিত্রাকে দেখে বৌটি জিজ্ঞাসু চোখে এগিয়ে আসে, জানতে চাইল “কাকে খুঁজছেন?” মিত্রা অল্প হেসে বলে, “রুদ্র তরফদার এ বাড়িতে থাকে?”
—হ্যাঁ, উত্তর আসে।
মিত্রা মুগ্ধচোখে বৌটিকে দেখে বলে, “আপনি কি
তার বৌ?”
মৃদু হেসে বৌটি “হ্যাঁ” বলে।
—সে কি বাড়িতে আছে, আজ তো রবিবার।
—ওতো তাস খেলতে বেরিয়ে গেছে। আপনি
ভেতরে আসুন , আমি ফোন করে দিচ্ছি। কি নাম
বলবো আপনার?”
“মিত্রা, মিত্রা কাঞ্জিলাল। ”
মিত্রাকে বসার ঘরে এনে বসিয়ে বৌটি স্বামীকে ফোন করে বলে, “মিত্রা কাঞ্জিলাল নামে একজন
ভদ্রমহিলা এসেছেন। ”
—কে মিত্রা?কথাটা আর্তস্বরে বলে চুপ করে থাকে
রুদ্র। তারপর, থেমে থেমে বলে,“আমি এখনি আসছি,ওকে যেতে দিওনা শ্যামলী। ”

মিত্রা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে বসার ঘরের চারদিক। কী সুন্দর সাজানো!অবাক হয়ে রুদ্রর বৌ শ্যামলীকে জিজ্ঞেস করে, “ আপনি এই ঘরটা সাজিয়েছেন?”
শ্যামলী হাসলো আবার। এমন সময় রুদ্র ঘরে ঢুকে বলে, “তুই এসেছিস বলেই আমি তাসখেলা ছেড়ে আসলাম মিত্রা। অন্য কেউ হলে আসতাম না।

দেওয়ালে টাঙানো রুদ্র তার বৌ ও ছেলের ফটোর দিকে অপলক তাকিয়ে কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনী ব্যাগ থেকে “বর্তমান থাক” বইটা বের করে রুদ্রর হাতে দিয়ে মিত্রা বলে, “আমার লেখা এই বইটা তোকে উপহার দেবার জন্য এসেছি রুদ্র। বইটা তোরা দু‘জনে পড়িস। রুদ্র‘র চোখের মধ্যে লাল শিরা ফুটে ওঠে। মিত্রা অন্যমনস্ক হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর, সচকিত হয়ে বলে, “সাতটা বাজে, আসি তবে, বাড়ি ফিরতে নয়তো অনেক রাত হয়ে যাবে।

মিলন পুরকাইত

কালপুরানে লেখা পাঠানোর নিয়মাবলি

লেখাটি আপনাদের পছন্দ হলে অবশ্যই একটা লাইক দিবেন এবং কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। যেকোনো সমস্যায় আমার মেইল ঠিকানায় অথবা ওয়েবসাইটের চ্যাট আইকনে ক্লিক করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, ধন্যবাদ।

ফেসবুক প্রোফাইল , ফেসবুক গ্রুপ , ফেসবুক পেজ , টুইটার , হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ , টেলিগ্রাম গ্রুপ , মেইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *