নেপাল থেকে ফিরে

ভ্রমন সাহিত্য

নেপাল থেকে ফিরে

নেপাল থেকে ফিরে – চিত্তরঞ্জন দেবভূতি
একটি বিশেষ প্রতিবেদন—

বাড়ীর পাশে ছবির মতো নেপাল দেশে আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে ভভোরে বিয়ে শুরু আর সন্ধ্যার মধ্যে কন্যা বিদায় দেয়….
যথাশক্তি তথা ভক্তি বলে বহুল প্রচলিত এই কথা অনেকে শুনেছেন৷দার্জিলিং জেলা থেকে 45 মিনিটের পথ,আন্তর্জাতিক সীমানা ,চেকিং পয়েন্ট সব পেরিয়ে ভোরেই নেপালের ভিতরে মারং জায়গায় পৌঁছে গেলাম৷চা বাগানের ভিতর দিয়ে রাস্তা,হিমালয় পর্বতের নিচে ছোট্ট আদিবাসী সাঁওতাল সমাজের বসবাস৷

বিয়ে বাড়ী,তমিজ মরর্মুর মেয়ে বাসন্তী বিয়ে৷সবুজ প্রকৃতির কোলে চারদিকে নাম না জানা হরেক রকম ফুল ফুটে আছে৷মাটির বাড়ী,বড় উঠান৷মাটি আর গোবর দিয়ে পরিপাটী করে মোছা বারোহাত শাড়ী সবাই পড়ে নি৷রঙ্গীন চাদর পেঁচিয়ে পরেছে ,উপরে ব্লাউজ আর ওড়না৷ যা দিয়ে বুক মুখ ঢেকে সময়ে কথা বলে৷মাথায় রুমান বা ঐ জাতীয় ছৈট্ট কাপড় চারভাঁজ করে রাখা৷মাথায় সু গন্ধে ম’ ম’ করা বুনো ফুল৷চোখ রাগে ভরা নয়,প্রীতিময়৷

খরচ বাঁচাতে ভোর বেলায় বিয়ের পর্ব শুরু৷খাওয়া চলছে৷চাল আর গুড় দিয়ে তৈরী আছূ হাঁড়িয়া,বড় বড় গ্লাসে দেওয়া হচ্ছে৷ সবার পা ধূইয়ে,নতুন গামছা দিয়ে মূছে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে৷

সকালের নাস্তা এলো মৈটা মোটা চারটে করে পুরী,ছোলার ডাল আর আলুর দম৷চা পানের অভ্যাসও চালু আছে এদিকে৷কত কাজ করছে মরদ গুলো৷মেয়ে বউরা ও সেই খাটছে৷শক্ত সামর্থ শরীর৷বেলা ১২—০০ মধ্যে কলা পাতায় ভাত ডাল সবজী মাংস৷আমাদের বাঙ্গালী সমাজে আমরা যতটা খেতে পারি,মানে অনেকের পাখির খাওয়ার মতো এরকম ২—৩ জনের খাবার এক এক জন অনায়াসে খেতে পারছেন দেখে ভালো লাগলো৷আমার এক আদিবাসী বান্ধবী সাবিনা,তাঁকে আস্তে করে বললাম এত ভাত ভাল সবজি মাংস খাচ্ছূন ওঁনারা তো গ্যাস,অম্বল বদহজম হবে না?

সাবিনা একগাল খিলখিল করে বললৈ ” আরে ইয়ার, ঐ যে দেখলি এক গ্লাস দু গ্লাস করে সব হাঁড়িয়া মেরে দিল,তো ঐ হাড়িয়া গ্যা,অম্বল,বদহজম, আর ও কি সব তোরা বলিস না?সব ঠিক করে দিবে৷”তারপর বললো সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে “আজ তো তোকে হাঁড়িয়া খেতেই হবে,আমিও খাবো,না হলে যে মাসি খুব রাগ করবে,বলবে তোর বন্ধূ হাঁড়িয়া ফিরিয়ে দিল,অপমান করলো,ওনর সাথে আর কৈনো কথা নাই৷”বান্ধবী
সাবিনাকে বললাম তোর সাথে যখন তোর মাসির মেয়ের বাড়ীতে এসেছি তো তুই যা বলবি,তাই করবো বা সেই মতো চলবো,ভুল বুজিস না….

দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ী এলাকার শিক্ষিত মেয়ে সাবিনা৷নর্থ বেঙ্গল ইউনিভারসিটি থেকে ইংরেজীতে এম.এ. পাশ করেছে৷লেখালেখির সূত্রে আমার সাথে সাবিনার পরিচয় পাঁচ বছর আগে৷আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে আদিবাসী সমাজের ভালো দিকসমূহ তুলে ধরবো বলে৷সাদা জিনস্ প্যান্ট আর কালো টি শার্ট পড়েছে৷দুজনে যেখানে যাচ্ছি নেপালে মারং এ ,লোকজন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,পাড়া গ্রামে সহজ সরল মনে যেমনটা হয় আর কি?

ডান হাত অর্ধেক ভাঁজ করে পালের কাছাকাছি এনে বড়দের প্রণাম জানাচ্ছি,সাবিনা বান্ধবী ওঁর আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে হিন্দিতে,কখনো সাদরী ভাষায়৷অনেকে বাংলাও বলেন৷ভারতেও তাঁদের যাতায়াত আছে৷

আদিবাসী বান্ধবী সালিনা বললো—” জানেন আমাদের সমাজে ছেলেরা পণ দিয়ে মেয়েদের বিয়ে করে বউ রূপে নিয়ে যায়৷

বিয়ে বাড়ীতে প্যান্ডেল আর লাইটের খরচ ও লোডশেডিং এর ব্যাপার নেই৷দিনের বেলা বিয়ে শুরু সন্ধ্যার সমাপ্ত করে রাতে যে যাঁর মতো শান্তির ঘুমের দেশে৷

হিমালয় পর্বতের নিচে নেপালে এমন বিয়ে বাড়ীতে আমার আগে যাওয়ার সুযোগ আসে নি৷যতো দেখছি ততো অবাক হয়ে যাচ্ছি৷নেপালী মেয়ে বউ পুরুষরাও এসেছেন সেজে গুঁজে৷পিতলের কলসী,গামলা,বালতি উপহার দিচ্ছেন অনেকে৷

নগ্ন ছবিতে ভরা,কামরতি আরও অনেক বিষয়ে বই দু একজনের জামার ভিতরে লুকানৈ৷কবিতার বই উপহার ?না এদিকে চালু হয় নি,এখনো৷বাঙ্গালী সমাজে সবখানে যেমন বই উপহার দিলে প্রীতিভোজে আগত লোকজন হাসে,এদিকে হাসাহাসি হয় অন্য বই আর ছবি নিয়ে,যেখানে আছূ নগ্নতা,আদিম পিপাসা মেটানোর পথ নির্দেশ৷যে গরু দুধ দেয় সেই গরু সময়ে লাথি মারে,সেই লাথি অনেকে হাসি মুখে হজম করে দিব্যি অনেকে বেঁচে আছেন !কী আর করা যাবে? এদিকে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে শুরু করেছে৷

রাতে থাকার ব্যাপার নেই৷অনেকে ঘরে ফিরতে প্রস্তুত৷এরমধ্যে চা বাগানে নড়চড়া শব্দ, ২—৩ করে লোক ভীড় করতে শুরু করছে দেখা যাচ্ছে? কি ব্যাপার?
এবার ফিরে যাচ্ছি নেপালে আদিবাসী সাঁওতাল অধ্যুষিত নেপাল দেশে মারং জেলায়৷যেখানে ভোর বেলা মেয়ের বাড়ীতে ছেলে বিয়ে করতে যায় সন্ধ্যার মধ্যে ঘরে ফিরে আসে,বর বউ পালকীতে আর সবাই হেঁটে!কার বাস দুর্ঘটনায় মরার ভয় নেই৷সাবিনা আমার আদিবাসী বান্ধবী,আগেই পরিচয় দিয়েছি,দার্জিলিং জেলার নকশাল বাড়ীর মেয়ে৷

আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে এই আধুনিক যুগে কি ভাবে অর্থের অপচয় কমিয়ে,শরীরের ধকল না বাড়িয়ে দিনের আলোয় সামাজিক রীতিনীতি মেনে বিয়ে হয় আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে এই সব নিয়ে কিছু লিখতে…সাবিনার মাসির বাড়ী বিয়ে বাড়ীর অনূষ্ঠান চলছিল৷অনেকে হাঁড়িয়ার হালকা নেশায় তন্দ্রাচ্ছন্ন৷হঠাৎ পাশেই জাপটাজাপটি হচ্ছে৷২—৩জন করে লোক জমা হচ্ছে৷অনেকের মনে অনেক রকম সন্দেহ …পরে কাছে গিয়ে জানা গেল একটা চিতাবাঘ ছাগলের টুটি কামড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর ছাগলটা বাঁচার জন্য ছটপট করছে৷সাবিনা আমাকে বললো “কি অবস্থা? এই ভাবে সবলের হাতে দুর্বলেরে প্রাণ যায়৷”


আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো হবে সাবিনা কিন্তু ওঁর দাবী আমি ওঁর মনের বন্ধু৷তাই জীবনের সব কথা আমাকে বলে৷কি বলে আর কি না বলে?সব কি আর লেখা যায়?একটু আভাষ দিচ্ছি— বলে “জানিস বন্ধু আমার প্রথম শরীর খারাপ মানে মাসিক এর কথা বলছি !বুঝলি?আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম,এখন তো জলভাত৷আমাদের বাগানে অনেক মেয়ে ট্যাবলেট খায়৷আর আছে,থাক সব তোকে বলবো না,কি বলবো আর কি লিখবি?তোর পাঠকরা কি ভাবে নেবে?তার কি কোনৈ ঠিক আছে?


আমি বান্ধবী সাবিনাকে বললাম,থাক আর বলতে হবে না,আমিও তো আমাদের দার্জিলিং জেলায় থাকি,তোর মতো অত না জানলেও আদিবাসী,নেপালী আর বাঙ্গালী সমাজ জীবন নিয়ে কিছু ধারণা আছে৷ আর তুই তো জানিস আমি বিবাহিত,ঘরে বউ আছে৷নারীর জীবন যেমন কঠিন,মন ও ততোটা নরম,আঘাত সহ্য করতে পারে না সবাই,দুধ দেওয়া গরুর মালিক যেমন,গরুর লাথি খেয়ে গরুর সেবা করে,গরুকে গরুর মতো খাটায় ,অনেকটা তো সেই রকম?সত্যি কি — না বল?


নেপালে দেখলাম মারং জেলায় আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে ‘মরদ’ আর কাকে বলে?একটা গাছূর মোটা অংশ একাই ঘাড়ে একখান থেকূ আর খানে নিয়ে যাচ্ছে৷ছয় সাত বছরের বাচ্ছা ছেলেরা ‘সু সু’ করছে তো মাটিতূ গর্ত হয়ে যাচ্ছে৷ডাটা শাক,লাউ ডগা,কচুঁ শাক সবই খাচ্ছে৷আমার এক মরদ বন্ধূ তাঁর লক্ষ্মীরাম হাঁসদা,বিষাক্ত সাপ ধরে বিষের থলিটা কেটে বাদ দিয়ে তারপর পুড়িয়ে সাপের মাংস খায়৷


হরিণের মাংস খুব সুস্বাদু বলে লোকজনদের মুখে মুখে ফেরে এই কথা৷তবে ইদানিং হরিণ মারে না আর এদিকে৷আগে হরিণ শিকার করে মাটির নিচূ পুঁতূ রেখে কয়েক দিন পর সেই হরিণের মাংস রান্না করে অনেকে খেয়ে মজা লুটতো৷


বাড়ী ফিরতে হবে মানে নেপালের মারং জেলা থেকে ভারতে পশ্চিম বাংলায় দার্জিলিং জেলায় ফিরবো৷খাওয়া দাওয়া আগেই হয়েছে৷কথা রাখতে একগ্লাস হাঁড়িয়া পান করে ছিলাম৷বান্ধবী সাবিনা বলেছিল,আমার কাছে কাছে থাকবি,রোদে যাবি না,রোদে গেলূ নেশা লাগবে৷এই দ্যাছ “আমি দুই গ্লাস হাঁড়িয়া খেয়েও দিব্যি হুঁশে আছি,তুই আর এক গ্লাস নিবি?” আমি বললাম— “বিদেশে এসেছি সাবিনা,ভয় লাগে,যদি নেশা লাগে তো কি হবে?”বান্ধবী বললো তোর মন না চায় তো খাবি না৷


সংকোচ হলেও লিখছি নেপালে দেখলাম অনেক দেশে মেয়ে বউরা শরীর যতটা পারে ঢেকে রাখে,নেপালে সবার মধ্যে এমনটা দেখলাম না,বান্ধবী সাবিনা বললো “ঘুরতে যখন এসেছিস আমার সঙ্গে তো চারদিক ভালো করে সব দেখ৷মেয়ে বউরা কি ভাবে শরীর দেখায়,লজ্জা শরম কম,মেয়েরা টি শার্ট গায়ে দিয়েছে তো শার্টের একটি করে বোতাম খোলা৷নেপালী গান অনেক জায়গায় শুনলাম—” তু মেরা হিরো হ্যায়….” এই রকম৷


অবশেষে সবার কাছে বিদায় নিয়ে ভারত নেপাল সীমান্তে মেচী নদীর ব্রীজ জীপ নিয়ে যখন পার হচ্ছি তখন সন্ধ্যা ঘণিয়ে আসছে৷সামনে নকশালবাড়ী রথখোলা এলাখার বিশাল ফরূস্ট,প্রথম নকশাশাল আন্দোলন ১৯৬৮ সালের দিকে এখান থেকে শুরু হয়েছিল৷ আর্মস্ ট্রেনিং হতো এই সেই জঙ্গল৷ একটু আসতেই হাতের বাঁ পাশে বেঙ্গাইজোত গ্রাম৷নকশাল আন্দোলনে নিহত শহীদদের শহীদ বেদী৷আবক্ষমূর্তি বসানো৷ যা নিয়ে লিখবো আবার অন্য কোনো দিন৷ এখানে বান্ধবীর নামটি কাল্পনিক ৷সবাই ভালো থাকুন৷আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ৷

কালপুরানে লেখা পাঠানোর নিয়মাবলি

লেখাটি আপনাদের পছন্দ হলে অবশ্যই একটা লাইক দিবেন এবং কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। যেকোনো সমস্যায় আমার মেইল ঠিকানায় অথবা ওয়েবসাইটের চ্যাট আইকনে ক্লিক করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, ধন্যবাদ।

ফেসবুক প্রোফাইল , ফেসবুক গ্রুপ , ফেসবুক পেজ , টুইটার , হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ , টেলিগ্রাম গ্রুপ , মেইল

1 thought on “নেপাল থেকে ফিরে

  1. আমার নেপাল ভ্রমণ, আদিবাসী সমাজের বিয়ে,ভোর বেলা শুরু আর সন্ধ্যা মধ্যে শেষ,মাঝখানে রোমাঞ্চকর সব ঘটনা,কালপুরান পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ আরশাদ আল গালিব বন্ধুসম প্রকাশ করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ৷অনিচ্ছাকৃৃত ভাবে আঞ্চলিক শব্দ,এখেবারে খোলামেলা কথা বার্তা চলে এসেছে৷বাস্তব জীবনের ছবি দর্পণে যেমনটা দেখা যায় সাক্ষিত্য আসলে তাই৷

    সবাই ভালো থাকেন,মাক্স পড়েন,খাওয়ার আগূ সাবান জলে হাত ধোবেন প্লীজ৷আজ এমন দিন এসেছে যে নিজে বাঁচলে বাপের নাম এই রকম আর কি?সামাজিক গদূরত্ব মেনে চলতে তৈ হবেই৷
    সবাই ভালো থাকুন,ভারত +বাংলাদেশ মৈত্রী
    দীর্ঘজীবী হোক …
    চিত্তরঞ্জন দেবভূতি
    EDITOR-PAHAR THEKE SAGAR MAGAZINE
    জেলা—দার্জিলিং
    পঃবঙ্গ,ভারত৷C

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *