উত্তরণ

উত্তরণ

গল্প সাহিত্য

উত্তরণ

শিরোনাম : উত্তরণ
কেয়া চক্রবর্তী

রোজদিনের মতই ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। শীতের সকালে কুয়াশায় দূরের জিনিস খুব একটা স্পষ্ট নয়, হঠাৎ পথের ধারে একটি যুবতী মেয়েকে খুবই অসহায়ভাবে পড়ে থাকতে দেখে বছর ৫৫ র বিপত্নীক ড: অনিন্দ্যসুন্দর সেন এর মনটা জানি কেন মুষড়ে গেলো। কি করবেন বুঝতে পারছেন না। মেয়েটিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো এখানের নয়। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।

পরনের পোশাক ও শতছিন্ন, ময়লা, সর্বাঙ্গে দারিদ্র‍্যের ছাপ স্পষ্ট। মলিন ও করুণ মুখে তাকিয়ে আছে, আর হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, একটু যদি জলের সন্ধান পাওয়া যায়। দেখে বড় মায়া হলো। এত সকালে কোনো দোকান ও খোলেনি তেমন, কিন্তু সেন মহাশয় এর চেনা এক চায়ের দোকান থেকে, এক বোতল জল কিনে এনে, যুবতীর হাতে দেওয়ায়, যেন মনে হলো হাতে চাঁদ পেয়েছে, চোখের নিমেষে এক বোতল জল প্রায় শেষ করে ফেলল, যেন মনে হয়, কতদিন জল পান করেনি।

এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের বস্ত্র দিয়ে আব্রু ঢাকার চেষ্টা করতে থাকে। আমি স্থানীয় ভাষায় কথা বলা শুরু করি, তোমায় দেখে তো এই অঞ্চলের মনে হচ্ছে না, তাহলে এখানে এলে কিভাবে? তুমি কি কিছু খাবে? দেখে বুঝতে পারলাম যে সে আমার ভাষা বুঝতে পারছে না। তখন বাংলায় বলার চেষ্টা করতে দেখি সে ঘাড় নাড়ে, তখন আমার সন্দেহ যে ঠিক সেই আভাস পাই, মেয়েটি যা বলে তাতে মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়, বাবা নেই, মামা বাড়িতে থেকেই মানুষ, মামা কাজে দেওয়ার নাম করে একদল লোকের কাছে মোটা টাকায় বিক্রি করে দেয়, ও কোনোরকমে সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসেছে,

আজ তিনদিন হলো এক ফোঁটা জল ও খাবার ও জোটেনি, বাবু একটু কিছু খেতে দেবেন, আমায়। অনিন্দ্যসুন্দর বাবুর মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। মেয়েটির জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসে জানতে চান, এখন কি করতে চায় সে? মেয়েটি জবাব দেয়, যদি তার একটা থাকার ব্যবস্থা করে দেন, সে সব কাজ জানে, বিনিময়ে সে কাজ করে দেবে। অনিন্দ্যসুন্দর বাবু বলেন তিনি আর তার বোন থাকেন, তার যদি আপত্তি না থাকে তো তাদের বাড়িতে যেতে পারে। মেয়েটির মুখে হাসির রেখা দেখা গেলো, এই অজানা শহরে মাথা গোঁজার এক ঠাঁই পেয়ে।

মেয়েটিকে সঙ্গে করে নিয়ে বাড়ি আসতেই বোনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম, কিন্তু মেয়েটির অসহায় অবস্থার কথা বলার পর বোন তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে তাকে পরিস্কার হয়ে এসে কিছু খেয়ে নিতে বলে। তখন মেয়েটার নাম জানতে চাইলে বলে রমা দলুই। তারপর রমা আমাদের বাড়ির সদস্য হয়ে যায়। দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে, ওর কাজ হয়ে গেলেই, দেখি আমার লাইব্রেরির আসে পাশে ওকে ঘুরঘুর করতে।

একদিন ওকে ডেকে জানতে চাই, কি হলো তুই কি কিছু বলতে চাস? তখন বলে বাবু আমার খুব পড়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বেশিদূর পড়া হয়ে ওঠেনি, সংসারের অভাবের জন্য। আমি জানতে চাই, কতদূর পড়েছিস, ও বলল ক্লাস ৪ অবধি। একটি বই ওকে পড়তে দেয়ায় খুব খুশি হয়, আমি বলি কাজ শেষ করে পড়ে রাখবি, আমি কাল জানতে চাইবো, কতদূর তুই বুঝতে পেরেছিস? এখন যা। রমার সেই হাসিমুখ ভোলার নয়।

যথারীতি পরের দিন জানতে চাইলে, প্রায় সব প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিতে পারায়, ও পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে, আমি একটা খাতা ও পেন ওকে দি। আর বলি, কাল থেকে তোর পড়া শুরু করবো, আর এই খাতায় সারাদিনের সবকথা যা তোর মনে আসবে, তোর অতীত, বর্তমান জীবনের কথা লিখতে বলি, আমি ভুল শুধরে দেবো। শুরু হয় রমার নতুন জীবনে উত্তরণ।

কিছুদিন যেতেই রমার আগ্রহ দেখে অবাক হয়ে যাই, শুধুমাত্র সুযোগ পায়নি বলে মেয়েটির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়া হয়নি। বোনের সাথে পরামর্শ করে রমাকে নাইট স্কুলে ভর্তি করে দি, আর বলি ওই যে খাতায় সারাদিনের সবকিছু লিখে রাখতে বলেছি, সেই কাজটাও যেন করে রাখে। রমার স্কুলে রমার পড়াশোনা বেশ ভালোই চলছিল, দেখতে দেখতে বেশ কয়েকবছর কেটে গেলো।

একদিন হঠাৎ ই ওই খাতাটি যেটি ওকে আমি দিয়েছিলাম, সেটা আমি পেলাম, পড়ে আমি হতবাক হয়ে যাই। কি সুন্দরভাবে ও সেখানে ওর জীবনের নানা ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করেছে। খাতাটি নিয়ে আমি আমার চেনা এক পত্রিকার অফিসে যাই, তারা তো ওই লেখাটি ছাপানোর জন্য আমায় দিতে বলে, কিন্তু পরের জিনিস না বলে কিভাবে দি, এই উৎকন্ঠায় দিন কাটে, পরে সিদ্ধান্ত নি যে না ছাপা হোক, কিভাবে কঠিন সংগ্রাম করে আজ রমা এই পৃথিবীতে তার স্থান বানানোর চেষ্টা করেছে, যা দেখে অন্য মেয়েরাও নিশ্চয়ই অনুপ্রেরণা পাবে।

পত্রিকার অফিসে খাতাটা জমা দিয়ে আসি, ওরা ওটা ধারাবাহিক রচনা হিসাবে প্রকাশিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর ই রীতিমত সাড়া পড়ে যায় চারিদিকে। অবশেষে রমা তার সাফল্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আজ তার উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা। সেখানে ও সে খুব ভালো রেজাল্ট করে, বিকেলে সামান্য সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

মঞ্চে রমাকে ডাকা হয়, সম্মান হাতে নিয়ে তাকে কিছু বলার অনুরোধ করা হলে রমা বলে, আজ যদি তিনি অনিন্দ্যসুন্দর বাবুর আশ্রয় ও ছত্রছায়া না পেতেন, তাহলে তার জীবনের এই উত্তরণ সম্ভব ছিল না। তাঁর মতো শিক্ষকের সাহচর্যেই আজ এই উত্তরণ সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থী মাত্র ই নতুন কুঁড়ি, শিক্ষক হলেন সেই মালী, যার পরিচর্যায় সকল কুঁড়ি ফুল হিসাবে বিকশিত হবে, আর সব চারাগাছ ই কোনো একসময় মহীরুহ তে হবে পরিণত।

কালপুরানে লেখা পাঠানোর নিয়মাবলি

লেখাটি আপনাদের পছন্দ হলে অবশ্যই একটা লাইক দিবেন এবং কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। যেকোনো সমস্যায় আমার মেইল ঠিকানায় অথবা ওয়েবসাইটের চ্যাট আইকনে ক্লিক করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, ধন্যবাদ।

ফেসবুক প্রোফাইল , ফেসবুক গ্রুপ , ফেসবুক পেজ , টুইটার , হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ , টেলিগ্রাম গ্রুপ , মেইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *